
ইমদাদুল হক: ঢাকার সাভারের আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকায় অবৈধ গ্যাস সংযোগের কারণে ভোগান্তিতে পড়ছেন বৈধ গ্রাহকগণ। অবৈধ সংযোগের কারণে বৈধ আবাসিক গ্রাহকদের বাসায় গ্যাসের ‘প্রেসার’ কমে যাওয়ায় রান্নাবান্নাসহ গৃহস্থালি কার্যক্রমে ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রাহকরা।
একটি অবৈধ চক্র তিতাসের হাই-প্রেসার এবং লো-প্রেসার উভয় লাইন থেকে সম্পূর্ণ অবৈধ এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভাবে নিম্নমানের পাইপ ও ফিটিংস ব্যবহার করে আশুলিয়ার বিভিন্ন বাসাবাড়িতে গ্যাস সংযোগ প্রদান করেছে। তারা এই সংযোগ প্রদান করে অবৈধ সংযোগ গ্রহণকারী বাড়ির মালিকদের থেকে এককালীন এবং পরবর্তীতে প্রতি মাসে বিভিন্ন অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বাড়ির মালিক এই প্রতিবেদককে জানান, এই অবৈধ সংযোগ প্রদানে তিতাসের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও কর্মচারীও জড়িত রয়েছেন।
অপরদিকে, তিতাস গ্যাস ট্র্যান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসি এর সাভার জোনাল বিপনন অফিস এবং আশুলিয়া বিক্রয় অফিসের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন অভিযান পরিচালিত হয়। তবে এই অভিযানে পুরাপুরি শেষ হয়না অবৈধ গ্যাস সংযোগ গ্রহন প্রক্রিয়া। সাভার ও আশুলিয়া অনেক বড় জায়গা। একদিক থেকে তিতাস কর্তৃপক্ষ অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে, অন্যদিক থেকে নতুন করে আরও অবৈধ সংযোগ নেওয়া হয়। এই ইঁদুর-বিড়াল দৌড়ে তিতাস কর্তৃপক্ষই পিছিয়ে থাকে।
আবার এমনও হয়, দুপুরে তিতাস কর্তৃপক্ষ অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে গেছে, সেই রাতেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন বাড়িগুলোতে পুনরায় অবৈধ সংযোগ লাগানো হয়েছে। এবিষয় নিয়েও বৈধ গ্রাহকগণ তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
মো: ওমর আলী নামের এক বাড়িওয়ালা জানান, ‘আমরা বৈধ ভাবে গ্যাস সংযোগ গ্রহণ করেও অবৈধ সংযোগ গ্রহণকারীদের জন্য গ্যাসের প্রেসার পাই না। এব্যাপারে তিতাস কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা গ্রহন করে না। তিতাসের কর্মকান্ড শুধু লোকদেখানো অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ভিতর। কিন্তু যেদিন এসব সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়, রাতের আঁধারে আবারও তাদের সংযোগ দেয়া হয়। এগুলো কারা দেয়? তিতাসের হাই-প্রেসার সংযোগ থেকে এই অবৈধ সংযোগ দেওয়াটা ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ, এসংক্রান্ত টেকনিক্যাল কাজ তিতাসের দক্ষ কর্মচারীদের দ্বারাই সম্ভব। এখন সর্ষের ভিতর ভুত থাকলে সেটা তাড়াবে কে?’
সরেজমিন আশুলিয়ার ধামসোনা থানাধীন উত্তর গাজীরচট ভুইয়া বাজার এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে আরেক চিত্র। এখানে বিভিন্ন টিনশেড বাসাবাড়ি এবং সাত-আটতলা বাড়িতে চলছে আরেক খেলা। এসব বাড়িগুলোর অনেকগুলোই ২০১৫ সালের অনেক পরে বানানো। তাই বৈধ ভাবে গ্যাস সংযোগ গ্রহণ তাদের পক্ষে সম্ভব হয় নাই। কারণ ওই সময়সীমার পরে সরকার নতুনভাবে আবাসিক গ্যাস সংযোগ দেওয়া বন্ধ রেখেছে। এজন্য অসাধু চক্রের কাছ থেকে তারা টাকার বিনিময়ে অবৈধ গ্যাস সংযোগ গ্রহন করতে বাধ্য হন।
আবার, অনেক বাড়িওয়ালার বৈধ চুলা থাকে যদি ৪টা, তারা অবৈধভাবে আরও অধিক পরিমাণে চুলা লাগিয়ে গ্যাস ব্যবহার করে থাকেন। এতে করে সরকার হারায় রাজস্ব, বৈধ গ্রাহকগণ পায়না প্রয়োজনীয় গ্যাসের ‘প্রেসার’। আর এই বিষয়টি নিয়েও তিতাসের নেই সার্বিক নজরদারি। কারণ আশুলিয়ার মতো এতবড় এলাকায় নিয়মিত এই অতিরিক্ত চুলা তদারকির মতো জনবলও তিতাস কর্তৃপক্ষের নাই। সেই সুযোগে বাড়ির মালিকগণ অতিরিক্ত চুলা ব্যবহার করে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছেন।
এরকম একটি বাড়ির সন্ধান পাওয়া যায় উত্তর গাজীরচট ভুইয়া বাজার এলাকায়। ইলিয়াস ভুইয়া নামের একজনের ৭তলা একটি বাড়ি যেটা ২০১৫ সালের অনেক পরে বানানো। এই বাড়ির প্রতি ফ্ল্যাটে এক এক রুমে একটি করে ডাবল চুলা দেখতে পাওয়া গেছে। তাতে করে ৭তলা এই বাড়িতে আনুমানিক ১৫০টির অধিক চুলা থাকার সমূহ সম্ভাবনা। কিন্তু এতগুলো চুলার অনুমোদন এই বাড়ির মালিকের নেই; কারণ এই বাড়ি নির্মাণকালে নতুনভাবে আবাসিক গ্যাস সংযোগ দেওয়া বন্ধ রয়েছে।
উত্তর গাজীরচট ভুইয়া বাজার এলাকায় এরকম অনেক সুউচ্চ বিল্ডিং দেখতে পাওয়া গেছে যারা এইভাবে অতিতিক্ত চুলা ব্যবহার করে সরকারকে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছেন মাসের পর মাস। এবিষয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন তিতাস কর্তৃপক্ষ।
বিষয়টি নিয়ে মুঠোফোনে কথা হয় তিতাস গ্যাস টিএন্ডডি পিএলসি আশুলিয়া বিক্রয় অফিসের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী আবু ছালেহ মুহাম্মদ খাদেমউদ্দিনের সাথে। এই প্রতিবেদককে তিনি জানান, আশুলিয়ার বিভিন্ন এলাকাভিত্তিক ‘এসাইন’ করা আমাদের লোক রয়েছে। এধরণের খবর যখনই আমরা পাই আমরা সেখানে অভিযান চালাই। যে এলাকার কথা বলেছেন বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ গ্যাস আইন, ২০১০ এর উপধারা ১ এর
(গ) সরবরাহ লাইন হইতে অবৈধ সংযোগ স্থাপন করিয়া গ্যাস ব্যবহার করা এবং (চ) অনুমোদিত সংখ্যার অতিরিক্ত, বা অতিরিক্ত ক্ষমতাসম্পন্ন, গ্যাস সরঞ্জাম স্থাপনপূর্বক গ্যাস ব্যবহার করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এই ধারায় কোনো গৃহস্থালী গ্রাহক দোষী সাব্যস্ত হলে, তিনি অনধিক ৩ মাস কারাদন্ডে বা অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদন্ডে বা উভয় দন্ডে দন্ডনীয় হবেন এবং একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটলে উক্ত ব্যক্তি অন্যূন ৩ মাস এবং অনধিক ৬ মাস কারাদন্ডে এবং অনধিক ২০ হাজার টাকা অর্থ দন্ডে দন্ডনীয় হবেন।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় তিতাস কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা, জনবলের অভাব এবং প্রভাবশালী কুচক্রী মহলের আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হবার ইচ্ছাপূরণেই অবৈধ গ্যাস সংযোগ এবং অতিরিক্ত চুলা ব্যবহার করে সরকারকে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার প্রক্রিয়াটি শেষ হচ্ছে না। একদিক থেকে তিতাস কর্তৃপক্ষ অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে, অপরদিকে রাতের আঁধারে পুনরায় সংযোগ গ্রহণ নেওয়া হয়। পৌণ:পুনিক চলে এই আলো আঁধারির খেলা। এই খেলা থেকে মুক্তি চান সাভারের বৈধ গ্যাস সংযোগ গ্রহণকারীরা।
Barta Mela bangla online newsportal